আষাড়ে ঈদ

 

এখন ঠিক মাঝরাত, চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার। সরু যে রাস্তা ধরে আমরা হেঁটে চলেছি তার দু’পাশে আম গাছের সারি। আষাঢ়ের আকাশ চুইয়ে ছোট ছোট বৃষ্টির ফোঁটা আম পাতার উপর টুপটুপ করে ঝরে পরছে। পাতার উপর বৃষ্টির ফোঁটা অদ্ভুত এক ছন্দে  ভরিয়ে দিচ্ছে চারপাশটাকে। সঙ্গে কোলাব্যাঙ আর কাঁচপোকার একটানা ঝিঁঝিঁ শব্দে চারপাশে যেন সুরের মাতোয়ারা। হাতের মোবাইল ফোনের টর্চটা কিছুক্ষন নিভিয়ে আমি একলা দাঁড়িয়ে চারপাশটাকে অনুভব করে নেয়ার চেষ্টা করি। আমরা যাচ্ছি আগৈধ গ্রামের সলিম মিয়ার বাড়ি দাওয়াত খাওয়ার জন্য। এ গ্রামে প্রতি ঈদের পরদিন ফুটবল প্রতিযোগীতা হয়,খেলায় যে দলই জয়ী হোক খেলা শেষে খাসী জবাই করে সবাই মিলে ভুরীভোজ করে। গত বেশ কয়েক বছরে এটাই যেন রীতি এ গ্রামের। কোনবার ‘বিবাহিত-অবিবাহিত’ এই দুই গ্রুপে আবার কোনবার ‘ঢাকা’ বনাম ‘আগৈধ’ গ্রুপে ফুটবল প্রতিযোগীতা হয়। এবার ‘ব্রাজিল’ বনাম ‘আর্জেন্টিনা’ নামে দুই দল খেলে । খেলা শেষে রান্না-বান্নার সব কিছু জোগাড় করতে বেশ রাত হয়ে যাওয়ায় ভুরীভোজের আয়োজন মাঝরাতে করতে হচ্ছে। একেক বছর একেক জনের বাড়িতে এ ভোজনের আয়োজন হয়। এবার যেমন সলিম মিয়ার বাড়িতো আর বছর পলান কর্মকারের বাড়ি।

আমি আর আমার চাচাত ভাই ঢাকা থেকে ঈদ করতে গ্রামে এসেছি বলে আমাদের বিশেষ নিমন্ত্রণ। আমাদেরকে নিতে এসেছে খেলার গোলকিপার কিশোর মিরাজুল। এমন ঘন অন্ধকার চারপাশ, যেন টর্চ বন্ধ করলে নিজের শরীরকেই দেখা যাচ্ছেনা। ‘এত ব্যাঙ ডাকে কেনরে, ওরা কি বৃষ্টি আসার জন্য এত ডাকাডাকি করে নাকি?’ মিরাজুলকে এই কথা আমি বলা মাত্রই ও একটা লাজুক হাসি দিয়ে বলল, ‘আমি কি কমু ভাই,আপনারাতো আমাগো চাইতে শিক্ষিত । বর্ষাকালে ব্যাঙ ডাকে কি করার জন্য সেতো আপনিই ভালো জানেন।‘ ওর ইঙ্গিতপুর্ণ কথায় আমিই যেন লজ্জায় পড়ে গেলাম।

এই নিঝুম অন্ধকারে কাদামাখা পথে হাঁটতে বেশ ভালই লাগছে। কোন এক রুপকথার রাত হঠাৎ যেন হাতে এসে ধরা দিয়েছে। সলিম মিয়ার বাড়িতে ঢুকার একটু আগেই একটা ছোট খালের মত জলাধার পেরুতে হয়। বোঝাই যায় এটুকু শুধু বর্ষায় পানিতে ভরে উঠে। টর্চের আলোয় দেখলাম চারপাশে প্রচুর কচুরীপানা। তার ফাঁক গলে একটা ছোট খেয়া নৌকা থামানো আছে। এত রাতে নৌকার মাঝি থাকেনা ,তবে লগি-বৈঠা নৌকায়ই থাকে । যার প্রয়োজন সে নিজেই খেয়া বেয়ে পার হয়। লগি হাতে মিরাজুল দুই পাশের ‘টাগই’  সরিয়ে আমাদের পার করে। বড় বড় কচুরীপানার সাথে নৌকার আঘাতের শব্দ নিস্তব্ধ রাতে কি এক অদ্ভুত মাধুরী তৈরী করে।

সলিম মিয়ার বাড়িতে ঢুকে দেখি উঠানের মাঝখানে পলিথিনের শামিয়ানা টানানো,তার মাঝে উজ্বল হ্যাজাক বাতি জ্বালানো। একপাশে বাড়ির মেয়েরা পেঁয়াজ,রসুন, আদা ইত্যাদি কেটে রাখছে একটা ডালিতে। আরেকপাশে দু’জন  খাসি কাটাতে ব্যস্ত। ওপাশে উঠানের নতুন কাটা উনুনের উপর কাঁদার প্রলেপ দেয়া ডেকচি বসানো। ঘরের দেউরীতে বসে কয়েকজন একসঙ্গে চড়া সুরে গাইছে, “ গ্রামের নওজোয়ান,হিন্দু-মুসলমান মিলিয়া বাউলা গান আর ঘাটু গান গাইতাম…।”

রান্না শেষ হল রাত তিনটায়। বেশ ক’টা শীতল পাটিী একসঙ্গে বিছানো হয়েছে। তার উপর কয়েকটা বড় তস্তরীতে খিচুড়ি মাংস রাখা হয়েছে। সবাই আলাদা আলাদা বাসনে না নিয়ে বড় থালার চারপাশ ঘিরে বসে সেখান থেকেই সবাই খাবার মুখে উঠিয়ে নিচ্ছে। ওদিকে টিনের চালে টুপটাপ হালকা বৃষ্টির সাথে সদ্য রান্না করা খাবারের ঘ্রাণ আর চারপাশের নিস্তব্ধ অন্ধকার চারপাশটাকে যেন এক মায়াপুরী বানিয়ে ফেলেছে।

খাওয়া দাওয়া শেষে আবার আমরা বাড়ির পথে রওনা দিই, সাথে মিরাজুল। খেয়া পার হওয়ার পর মীরজান চাচার বাড়ির সামনে আসলে মিরাজুল বলে “মীরজান চাচার গল্প শুনছেন ভাই ? গতবার আগৈধের বৈশাখী মেলা থেকে মীরজান কাকা সাপ তাড়ানোর মাদুলি কিনে কোমড়ে বেঁধে রাখে, মেলার দুই দিন পরই সন্ধ্যার সময় দেখে বিরাট এক গোখরা ফণা তুলে ঘরের সামনে  দাঁড়ানো। মীরজান কাকা লুঙ্গী কোমরে উঠিয়ে গোখরার ফণার সামনে যেয়ে বলে,  ‘আয় ,আয় তর নিগাই আনছি এই তাবিজ। আয় আইজকা তর একদিন কি আমার একদিন।’ সাপের সামনে যেতে সাপ যখন ফস্ করে  আরো সামনে চলে আসে, মীরজান কাকা তখন লুঙ্গী ফেলেই উল্টাদিকে দৌড়। হাঁটতে হাঁটতে শরীর বাঁকিয়ে মীরাজুল অভিনয় করে সাপের সামনে মীরজান কাকার সংলাপ দেখায়। আমরা হাসতে হাসতে মরি।

কথায় কথায় কখন আমাদের বাড়ির সামনে এসে পড়ি। ওদিকে বৃষ্টি শেষ হয়ে আকাশ কিছুটা মেঘমুক্ত হতে শুরু করেছে। মেঘের ফাঁক গলে দেখা যায় ঈদের দ্বিতীয় দিনের ক্ষীণ কাস্তের মত চাঁদ। চারপাশ থেকে পাট পঁচার গন্ধ আসছে। ঘুমুতে যেতে হবে। সকাল হয় হয় প্রায়।


Copyrights © 2021 Arefin | Gastroenterology | Developed by Chumbok IT