ভ্রমণ বিষয়ে আজ পর্যন্ত অনেক লেখাই পড়েছি। সঞ্জীব চট্রপাধ্যায়ের ‘পালামৌ‘ (বন্যেরা বনে সুন্দর- যে বইয়ের বিখ্যাত উক্তি) থেকে শুরু করে হাল আমলের সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘পায়ের তলায় সর্ষে‘ পর্যন্ত। তাঁরা অবশ্য জ্ঞানী-গুণী মানুষ, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ডাক পান বিভিন্ন বিষয়ে বক্তৃতা দেয়ার জন্য। আমার মত ক্ষুদ্র মানুষেরা ঘরের কোণের শিশির বিন্দু দেখেই পৃথিবীর রুপ-রস খোঁজার চেষ্টা করি। সুনীল নাকি ছোট বেলায় জাহাজের লস্কর হতে চেয়েছিলেন পৃথিবীটাকে চষে বেড়ানোর জন্য। আমি অবশ্য লস্কর হতে চাইনি কিন্তু পৃথিবীটাকে জানার ইচ্ছায় ছটফট করি। জায়গা ভ্রমনের মত সময় ভ্রমণও আমাকে ভীষণ আলোড়িত করে। যখন কোন দেশের ইতিহাস পড়ি তখন মনে হয়, সময়ের ব্যাক গিয়ারে চেপে পেছনের কোন এক সময়ে চলে গিয়েছি আমি। আর সে সময়টাতে চষে বেড়াচ্ছি ইচ্ছেমত।

প্রথম সমুদ্র দেখার সময় মনের ভিতর যে রোমাঞ্চ অনুভূত হয় তা যেন প্রথম প্রেমে পড়ার চেয়ে কোন অংশে কম নয়। সমুদ্র দর্শনের আগে দূর থেকে সমুদ্র গর্জন শ্রবণের স্মৃতি আজও ভুলবার নয়। তখন আমরা সবেমাত্র দ্বিতীয় বর্ষে উঠেছি। অনিবার্য কারণে কলেজ ২ সপ্তাহের জন্য বন্ধ হয়ে গেলে আমরা ৩ বন্ধু মিলে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত দেখতে চলে যাই। সেখানে পৌঁছতে পৌঁছতে রাতের অন্ধকার নেমে আসে। সমুদ্রকে চোখে দেখার আগে দূর থেকে এর গর্জন মনের ভিতর যে ঢেউ তুলেছিল তা যেন আজও বুকের ভিতর কান পাতলেই শুনতে পাই। সৈকতের ধারে বালুকাবেলায় এক অন্ধ বাউল আর তার ছোট্ট মেয়ে লালন ফকিরের গান শুনিয়েছিলেন একতারা বাজিয়ে। সবুজ নারকেল গাছের পাতার ফাঁকে তাকিয়ে দেখি শিং-এর মত বাঁকা রুপালী চাঁদ উঠেছে আকাশে, চারপাশে কাকজোছনা। বাউলের সেই উদাস করা একতারার সুর আজও যেন মনের কোণে গুনগুনিয়ে সুর তুলে যায়।

 

এরপর আরও অনেকবার সমুদ্র দেখতে গিয়েছি। কখনো কক্সবাজার,কখনো সেন্টমার্টিন,আবার কুয়াকাটা অথবা সুন্দরবনের কটকা। কখনো বাস্তবে ,কখনো কল্পনায়। বৃষ্টিভেজা শেষ বিকেলে প্রেমিকার হাত ধরে রিকশায় ঘুরতে ঘুরতে স্বপ্নের জাল বুনেছি- শতচেনা আশপাশের পরিবাষটাকে ছুঁড়ে ফেলে সেন্টমার্টিন দ্বীপে বাসা বাঁধব দু‘জনে। বেছে নিব সহজ-সরল,সাধারন জীবন। সারাদিন জাল দিয়ে মাছ ধরব আমি, আর তুমি ঘরকন্না করবে। সুখে-শান্তিতে দু‘জনে সারাজীবন পার করে দিব সেখানে। কল্পনার জগতেও সমুদ্র বাস! কিন্তু বাস্তবতার জীবনতো ভীষণ কঠোর। সেখানে সমুদ্র অনেকটা চাঁদের মত, “ হাত ইশারায় ডাকে কিন্তু মুখে বলেনা, আমার কাছে আইলে বন্ধু আমারে পাইবানা “। বাস্তবতার জীবনে চাঁদ,সমুদ্র কিংবা প্রেমিকা সবই মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়- হাত ইশারায় ডাকে কিন্তু কাছে গেলেই হারিয়ে যায়। থাক,সেসব নিয়ে নাহয় অন্য কোথাও বলা যাবে।

এবার পুরনো দিন থেকে চলে আসি তরতাজা বর্তমানে। ঢাকা থেকে আমাদের যাত্রা শুরু কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের এক রাতে। চট্টগ্রাম হয়ে বান্দরবানে আমরা পৌঁছাই রৌদ্র ঝলমল এক দুপুরে। হোটেলে ফ্রেশ হয়ে নীলগিরির উদ্দেশ্যে রওনা হই চান্দের গাড়িতে চড়ে। আমাদের যাত্রা শুরু তিনটি গাড়িতে। সীমান্তের কাছে দাঁড়িয়ে আগে শুধু আফসোস করতাম- সুন্দর সুন্দর সব পাহাড় আর বন কেন সব ওপারে? দেশ ভাগের সময় একটি দু‘টি পাহাড়ও যদি আমাদের দেশে পড়ত! কিন্তু বান্দরবনের পর্বতরাজি দেখে আমার মনের সে আক্ষেপ মিলিয়ে গেল অজান্তেই।

বান্দরবনের পথ যেন গিরিপথ নয়- সে যেন আকাশ পথ। সমতল থেকে হঠাৎ করে ভূমি উত্থিত হয়ে নীল আকাশকে ছুঁতে চাইছে। পাহাড়ি ঢালের উপর দিয়ে চান্দের গাড়ি ওঠে আর মনে হয়, এইত আমি আকাশ ছুঁতে যাচ্ছি। গিরিপথ যেন নাটকের এপিসোড। এই উত্থান আবার ক্ষণেই চরম পতন। পাহাড়ি পথের দু‘পাশে নানা রঙের বুনো গাছের সারির ফাঁক দিয়ে ছড়িয়ে পড়া সূর্যরশ্মির প্রতিটিকে যেন আলাদা করে চেনা যায়। চারপাশের উজ্জ্বল নীলাকাশ, গাছের আড়াল ভেদ করে ছড়িয়ে পড়া সূর্যরশ্মি, আর পাহাড়ের উঁচু-নিচু ঢালু পথ দেখে আমরা মনের গেয়ে উঠি, “এই পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হত তুমি বলত? যদি পৃথিবীটা স্বপ্নের দেশ হয় তবে কেমন হত তুমি বলতো? “ সত্যিই সেদিন যেন আমরা কোন এক স্বপ্নের দেশে হারিয়ে গিয়েছিলাম।

পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল যেন বান্দরবনের পাহাড়ে এসে থেমে গেছে। প্রকৃতি তার সমস্ত সৌন্দর্য  এখানকার পর্বতশৃঙ্গে এসে ঢেলে দিয়েছে। আর সে সৌন্দর্য যেন ঝর্ণা হয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে পড়ছে। অনেকক্ষণ পর পর পর্বতের গায়ে একটা দুটো বাড়ি চোখে পড়ে। চলতি পথে খানিক চাহনিতেই বুঝা যায় আদিবাসী মহিলারা পুরুষদের চেয়ে বেশী কর্মঠ। চলতে চলতে  ভরদুপুরে আমরা ‘নীলগিরি‘ নামের সুন্দরী পর্যটন স্পটে পৌঁছাই। নীলগিরির সৌন্দর্যে আমরা সবাই মুগ্ধ হয়ে যাই। সুউচ্চ পর্বতের উপর মনোরম এক বিশ্রামাগার ‘নীলগিরি‘। নীলগিরির উপর থেকে নিচে তাকালে চোখ সৌন্দর্যের অতল গভীরে হারিয়ে যায়।

নীলাকাশ, সবুজ অরন্য নীলগিরিকে যেন চাদরের মত জড়িয়ে আছে। এখানে রাতের আকাশও যেন তারার চাদরে ঘুমায়। পর্বতের গায়ে মেঘের ছায়া স্থানে স্থানে রঙিন আঁচলের মত বিছিয়ে আছে। কখনো পাহাড়ের কিনারে, কখনো পাহাড়ি ঢালে দাঁড়িয়ে আমরা ছবি তুলি। কেউ কেউ মনের ক্যামেরায় চিরদিনের জন্য বন্দী করে নেই সুন্দরী নীলগিরির চোখ ধাঁধাঁনো সৌন্দর্যকে।

নীলগিরিতে দুপুরের খাওয়া দাওয়া শেষ করে আমরা আবার বান্দরবন শহরের দিকে রওনা হই। উঠে বসি চাঁদের গাড়িতে। পাহাড় ছুঁইয়ে আমরা ছুটে চলি শহরের দিকে। পিছিনে পড়ে থাকে সৌন্দর্যের লীলাভুমি নীলগিরি। গিরপথ,নীলাকাশ আর সবুজ বৃক্ষরাজি মিলেমিশে যেখানে একাকার।আকাশের বুকে সূর্য তখন অস্তগামী। ছুটে চলা গাড়ি থেকে বিমুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে দেখি পড়ন্ত আলোয় সবুজ পর্বতমালাকে। কনে দেখা আলোয় নাম না জানা তৃণরাজির শীষগুলি আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে মুখ উঁচু করে।

ফেরার পথে নামি ‘মিলনছড়ি শৈল্প্রপাতে‘। বছর কয়েক আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায় শৈল্প্রপাতে।তাদের স্মরণে সেখানে নির্মিত হয়েছে স্মৃতিসৌধ।শৈল্প্রপাতের পাদদেশে চায়ের দোকানে কিছুক্ষণ জিড়িয়ে নেই আমরা। সেখানে আদিবাসীদের হাতের তৈরী বিভিন্ন জিনিস কিনে আবার রওনা হই বান্দরবান শহরের দিকে। হোটেলে পৌঁছাতে রাত হয়ে যায়।চারপাশে তখন ঘন অন্ধকার।ঘন্টাখানেক বিশ্রামের পর আমরা হোটেলের কাছেই বান্দরবান সার্কিট হাউজে যাই,সেখানে আমাদের জন্য আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্য। জিপে চড়ে পাহাড়ি ঢাল বেয়ে উঠে আসি সার্কিট হাউজের সামনে।পুরো স্থাপনাটিই সেখানে ঢালু পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত।পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত বিভিন্ন বাড়ির বৈদ্যুতিক বাতি অন্ধকারে অদ্ভুত এক আলোআঁধারির খেলা তৈরী করে। চারপাশে নিঝুম রাত। পাহাড়ি নির্জনতাকে জাগিয়ে দিতে শুরু হয় আমাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।পাহাড়ি-বাঙালির নানা গান আর নাচ আমাদের সবার হৃদয়ে সুরের ঢেউ তুলে। নাচতে নেমে যাই ধেই ধেই করে।বাইরে অবন্ধকার,শীতের কুয়াশা ঘেরা পাহাড়ি রাত। আমরা যেন কোন এক স্বপ্নজগতে এসে পৌঁছেছি। ‘হাজার বছর ধরে‘র টুনির বাবার বাড়ি থেকে নাইওর শেষে বাড়ি ফেরার সময় পথের মাঝে নৌকা থামিয়ে পূর্ণিমা রাতে ভেলুয়া সুন্দরীর পালাগান দেখতে নেমে যায়। আমরাও যেন  সেরকম কোন এক রোমাঞ্চকর উপন্যাসের রাতে অচেনা কোন গাঁইয়ে এসে পৌঁছেছি।

রাতের খাবার খেয়ে ফেরার পথে মনের ভিতর গুগগুনিয়ে সুর ভাসে “ মনের রঙে রাঙাবো,বনের ঘুম ভাঙাবো/পাহাড়,সাগর সবাই যে কইবে কথা “। পিছনে পড়ে থাকে আলো আঁধারির পর্বতচূড়া।পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে স্বর্নমন্দির হয়ে আমরা কক্সবাজারের উদ্দশ্যে বেড়িয়ে পড়ি। দূর থেকে শুনতে পাই সমুদ্রের গর্জন,যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে আমাদের। সেসব গল্প না হয় কোথাও হবে।


Copyrights © 2022 Arefin | Gastroenterology | Developed by Chumbok IT